ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জামা’আতে নামায ও ইমামতি

ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জামা’আতে নামায ও ইমামতি

ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জামা’আতে নামায ও ইমামতি

২০০৫ সালের ১৮ মার্চ অ্যামেরিকার নিউইওর্কের এক ক্যাথেড্রালে অভুতপূর্ব একটি ঘটনা ঘটে। তথাকথিত ধর্মীয় সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকজন মুসলিম নারী একটি উদ্যোগ নেন। নারী-পুরুষ মিলে সম্মিলিত জুমু’আর নামাজের ইমামতি করেন একজন নারী; নাম- আমিনা ওয়াদুদ। নারীরা জিন্স পরে, স্কার্ফবিহীন অবস্থায় নামাজে অংশগ্রহণ করে। এই ঘটনার ফলে পুরো মুসলিম বিশ্বে তুলপাড় শুরু হয়। নানান মহলে শুরু হয় প্রতিক্রিয়া।

আরও দেখুনঃ পিতামহ উপন্যাস বই রিভিউ সাব্বির জাদিদ

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে শায়খুল আযহার সাইয়েদ তানতাবী, মসজিদুল হারাম ও মসজিদ-ই-নববীর ইমামগণ, সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ও আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়া এমনকি বাংলাদেশের বায়তুল মোকাররমের তৎকালীন খতিব উবাইদুল হক (রাহিমাহুল্লাহ) ফতোয়া দেন। (বর্তমানে ভারত, অ্যামেরিকা, ডেনমার্ক, জার্মানির কয়েকটি মসজিদে নারী ইমাম জুমু’আর নামাজের ইমামতি করতে দেখা গিয়েছে)

২৫ শে জুন ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রফেসর ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক স্যার একটি স্টাডি সেশনে ‘ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জামা’আতে নামায ও ইমামতি’ টপিক নিয়ে একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। সেই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন দেশের খ্যাতনামা গবেষকবৃন্দ।যেমন:

ড. মুহাম্মদ আবদুল মা’বূদ
ড. মুহাম্মদ আব্দুস সামাদ
প্রফেসর ড. এএনএম রফীকুর রহমান
ড. মুফতি মুহাম্মদ আবু ইউসুফ খান
ড. আহমদ আলী প্রমুখ।

প্রফেসর ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক স্যারের পেপার প্রেজেন্টেশন এবং উপস্থিত আলোচকদের পরামর্শের নিরিখে বইটি রচিত।
বইটির মূল টপিক হলো দুটো। একটি হলো- নামাজে নারীদের ইমামতি, আরেকটি হলো মহিলাদের জামা’আতে নামাজ। লেখক বইয়ের বেশিরভাগ অংশজুড়ে আলোচনা করেন নারীদের ইমামতি নিয়ে। ঐদিন যারা জুমু’আর নামাজে নারীকে ইমাম হিশেবে উপস্থাপন করেছিলো, তাদের দলীল এবং যুক্তিগুলো নিয়ে গবেষক বিস্তর আলোচনা করেন।
এই আলোচনাকে লেখক মূলত দুইভাগে ভাগ করেন। মহিলাদের জামা’তে মহিলার ইমামতি নারী-পুরুষ সম্মিলতে জাম’আতে নারীর ইমামতি (যে পটভূমিতে বইটি রচিত) ‘মহিলাদের জামা’তে মহিলার ইমামতি’ অধ্যায়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক এই সংক্রান্ত কুরআন-হাদীসের কোনো নির্দেশনা আছে কি-না, এই সম্পর্কে চার মাজহাবের কী অবস্থান এবং অবস্থানের পেছনের দলীল যুক্তি তুলে ধরেন।

যেমন:
মহিলাদের জামা’তে মহিলার ইমামতির ব্যাপারে-
শাফে’ঈ মাজহাব: মুস্তাহাব বলেছে।
হাম্বলী মাজহাব: জায়িজ বলেছে।
হানাফী মাজহাব: মাকরূহ বলেছে।
মালেকী মাজহাব: বৈধ নয় বলেছে।

অতঃপর লেখক প্রবেশ করেন মূল আলোচনায়। অর্থাৎ, নারী-পুরুষের সম্মিলিত ফরজ, জুমু’আর নামাজে নারীর ইমামতি। লেখক এই অংশের আলোচনায় বলেন:
“রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুগ থেকে শুরু করে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫০০ বছরের ইতিহাসে কোনো নারীর ইমামতিতে নারী-পুরুষের সম্মিলিত নামাজ অনুষ্ঠানের নজির পাওয়া যায় না। এটি এতোটা অপ্রাসঙ্গিক ছিলো যে, ফিকহ সম্পাদনকালে নেতৃস্থানীয় অনেক ফকিহ এই সংক্রান্ত কোনো আলোচনা করেননি। মধ্যযুগে মুসলিম জাহানে মহিলা রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন সুলতানা রাজিয়া (১২৩৬-১২৪০), ভারত শাসন করেছেন শাজরাতুদ দূর (১২৫৮-১২৬১)। এই দুই যুগের রমণী বা তাদের যুগের অন্য কোনো রমণী নামাজে ইমামতি করেননি বা ইমামতির খায়েসও প্রকাশ করেননি।”
লেখক প্রমাণ করেন যে, পূর্ববর্তী আলেমগণের মধ্যে যারাই এই বিষয়ে কথা বলেছেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগের মত হলো- নারী-পুরুষ সম্মিলতে জাম’আতে নারীর ইমামতি বৈধ নয়। পাশাপাশি মাত্র ৪ জন ইমামের একটি ক্ষুদ্র গ্রুপ পাওয়া যায়, যারা বলেছেন- বৈধ। লেখক এই দুই দলের দলীল এবং যুক্তি পর্যালোচনা করেন।
অ্যামেরিকার ঐ ঘটনায় যারা জড়িত ছিলেন, তারা তাদের ঘটনা প্রসঙ্গে বেশ কিছু দলীল এবং যুক্তি হাজির করেছিলেন। যেমন: উম্মু ওয়ারাকার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) হাদীস। আলোচ্য বইয়ে লেখক সেই হাদীস, হাদীসের প্রেক্ষাপট এবং গ্রে-এরিয়া নিয়ে আলোকপাত করেন। লেখক ঐ মুভমেন্টের দলীল ও যুক্তির অসারতা তুলে ধরার চেষ্টা করেন অ্যাকাডেমিকভাবে।
বইয়ের শেষ অংশ হলো বর্তমান পরিস্থিতে মসজিদে গিয়ে নারীদের জামা’আতে অংশগ্রহণ, এই সংক্রান্ত হাদীস এবং ইমামগণের মতামত।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নারীদের নামাজ পড়া নিয়ে লেখক মাজহাবগুলোর ডিফল্ট অবস্থানের দিকে জোর দেন। অর্থাৎ, ঘরে নামাজ পড়া। পাশাপাশি, বর্তমান পরিস্থিতিতে যেহেতু নারীদের বিভিন্ন প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে হচ্ছে, সেহেতু মসজিদগুলোতে নারীদের নামাজের ব্যবস্থা রাখার ব্যাপারে লেখক গুরুত্বারোপ করেন।
যেমন: স্বামী-স্ত্রী শপিং করতে গেলো, সেক্ষেত্রে নামাজের ওয়াক্ত হলে স্বামী ঠিকই মসজিদে যেতে পারছে, কিন্তু স্ত্রী নামাজ পড়তে পারছে না; ওয়াক্ত চলে গেলে বাসায় গিয়ে আর ক্বাযা নামাজ পড়া আর হয়ে উঠে না। সেক্ষেত্রে, মসজিদে আলাদাভাবে নারীদের নামাজের ব্যবস্থা থাকলে সেটা উভয়ের জন্য সুবিধা হয়।
লেখক তাঁর বক্তব্যের ইতি টানেন এভাবে:
“কোনো জনপদে নারীরা মসজিদে যেতে চাইলে সেই কমিউনিটির অনেক করণীয় রয়েছে। নারীদের জন্য পৃথক প্রবেশদ্বার ও অযুখানার ব্যবস্থা করা উচিত। তেমনিভাবে নামাজ আদায়ের জন্যও পৃথক ব্যবস্থা রাখা উচিত। মসজিদে পৃথক ব্যবস্থা না থাকলে কিছুতেই মহিলাদের মসজিদে যাওয়া উচিত হবে না।”

পথ চলার গল্প ফাতেমা নাজনীন প্রিসিলা

এক নজরে বই পরিচিতি
____________________________
বই : ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জামা’আতে নামায ও ইমামতি
লেখক : প্রফেসর ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক
বইয়ের ধরণ : গবেষণাপত্র
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৯৬
প্রচ্ছদমূল্য : ৮০ টাকা
প্রকাশনী : বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার
রিভিউ লেখক : আরিফুল ইসলাম

বই ডাউনলোড করুনঃ ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জামা’আতে নামায ও ইমামতি pdf .ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জামা’আতে নামায ও ইমামতি boi.ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জামা’আতে নামায ও ইমামতি বই রিভিউ